একুশ শতকে এসে নগরের কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। কিন্তু চলার পথে এখনো নারীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। পাবলিক পরিবহন বলুন কিংবা গণশৌচাগার—কোথাও বাড়েনি সেবা। অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী নারীহোস্টেল-সংকটে ভোগান্তির মধ্যে আছেন। এমনকি একা কিংবা কয়েকজন নারী মিলে নগরের অতিথি হয়ে এলেও আবাসিক হোটেলে ঠাঁই পান না তাঁরা। নগরজীবনে নারীদের নানা ভোগান্তির কথা লিখেছেন আলী আসিফ।

নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে চাহিদার তুলনায় আসন অনেক কম
অপর্যাপ্ত আবাসন
সকালের রোদ মেখে যে বস্ত্রবালিকাটি হাতে টিফিনের বাটি নিয়ে কাজে যান, যে রুচিশীল নারীটি হালকা পাড়ের শাড়ি পরে হাতঘড়িটা বেঁধে নয়টার অফিসে যান, যে তরুণীটি কাঁধে বইয়ের ব্যাগ ঝুলিয়ে ক্লাসের পানে ছোটেন—এঁদের সবাইকে এই নগরে আবাসনের ভাবনাটা ভাবতে হয় সবার আগে। নিরাপদ আবাসনসংকটের এই নগরে এক টুকরো মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয় নারীদের। অনেক কষ্ট সয়ে যা-ও বা একটুখানি বাসস্থান মেলে, সেখানেও ডানা মেলে জাপটে ধরে সমস্যার জাল।
বেশি রাত পর্যন্ত ঘরে আলো জ্বালানো যাবে না, উচ্চ স্বরে কথা বলা নিষিদ্ধ, বাথরুম সারতে হবে তাড়াতাড়ি, রান্নাঘরে বেশি সময় কাটানো যাবে না—নীলক্ষেত আবাসিক এলাকার সাবলেটের বাসায় এমন কিছু নিয়ম মেনেই শুরু হয়েছিল জয়পুরহাটের মেয়ে রুমানার ঢাকার জীবন। শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী নারীদের অপ্রতুল আবাসস্থলের কারণে অনেক নারী মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন নগরের বিভিন্ন নারী হোস্টেল, মেস ও সাবলেট বাসায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্নাতক প্রথম বর্ষের ছাত্রীরা সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হলে সিট পান না। হলে সিট পেতে তাঁদের বছর খানেক অপেক্ষা করতে হয়। এঁদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী আজিমপুর সরকারি কলোনি, পলাশী স্টাফ কোয়ার্টার, মৌচাক কলোনি, এতিমখানা কলোনি, বিশ্ববিদ্যালয় স্টাফ কোয়ার্টারে সাবলেটে থাকেন। একই কক্ষে চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী একসঙ্গে থাকার কারণে নানা সমস্যারও সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে চাকরিজীবী নারীদের জন্য নগরে সরকারি মাত্র তিনটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল রয়েছে। এগুলোয় আবার সিট পাওয়ার জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকতে হয়। নীলক্ষেত কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে সিট মাত্র ৪৮২টি। এখানে সিটের জন্য এখন আবেদনপত্র জমা আছে তিন হাজারেরও বেশি, জানালেন এখানকার কর্মী ইসমত আরা।
কর্তাদের সাফাই
নারীর আবাসন সমস্যার কথা মহিলা অধিদপ্তরের কর্তাদেরও অজানা নয়। সরকারি পর্যায়ে আবাসনস্বল্পতা কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, জানতে চাইলে মহিলা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন বলেন, ‘মিরপুর ও খিলগাঁও কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে আবাসন-সুবিধা বাড়ানোর জন্য আমরা পরিকল্পনা কমিশনে একটি প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছি।’ প্রস্তাবটি অনুমোদিত ও বাস্তবায়িত হলে সমস্যা কিছুটা কমবে বলে তিনি আশা করেন।
বিআরটিসির বহরে দিন দিন বাসের সংখ্যা বাড়ছে। তবে বাড়ছে না মহিলা বাস সার্ভিস। এ বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মেজর এম এন ইকবাল বলেন, ‘আমাদের নতুন ১৭৫টি বাস এসেছে। কোন কোন রুটে বাসগুলো নামানো যায়, এ নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। যদি চাহিদা থাকে অবশ্যই আমরা নতুন মহিলা বাস নামাব।’
নাগরিক জীবনে নারীদের নানা সমস্যার কথা ডিসিসির মেয়র সাদেক হোসেন খোকা জানেন বলেই দাবি করলেন। অন্যান্য সমস্যার সমাধান দিতে না পারলেও গণশৌচাগার সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানালেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা জায়গা খুঁজছি। নারীদের জন্য পাবলিক টয়লেট তৈরির স্থান পেলে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।’
গণশৌচাগারে যাওয়ার পরিবেশ নেই
‘ঢাকার এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যাওয়ার সময় যে কারও বাথরুমে ধরতে পারে। পুরুষেরা এদিক-সেদিক কোথাও ছুটে যেতে পারে। কিন্তু মহিলারা পড়ে বিপদে। ডিসিসির পাবলিক টয়লেটে মহিলাদের যাওয়ার কোনো পরিবেশ নেই। মহিলাদের জন্য আলাদা পাবলিক টয়লেট করার বিষয়ে কোনো সরকারই চিন্তা করছে না। বেসরকারি কোনো উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।’ বলছিলেন বেসরকারি চাকুরে রাহনুমা আহমেদ।
রাহনুমার কথার সত্যতা পাওয়া গেল ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) কয়েকটি গণশৌচাগার ঘুরে দেখে। এগুলোয় মহিলাদের জন্য আলাদা কক্ষ রাখা হলেও সেগুলো ব্যবহার করার মতো পরিবেশ নেই। অনেক শৌচাগারের নারীদের কক্ষ পুরুষেরা অবাধে ব্যবহার করছেন। বছর খানেক আগে নগরের জনবহুল কয়েকটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার বসানো হয়েছিল। সেগুলোও রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় নয় হাজার ছাত্রীর জন্য টয়লেট রয়েছে মাত্র ২৮টি। অর্থাৎ সাড়ে ৩০০ ছাত্রীর জন্য একটি টয়লেটের ব্যবস্থা রয়েছে। নগরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মতোই দশা অন্যান্য এলাকার।
ঘুরে দেখা গেছে, শাহবাগ পাবলিক টয়লেটের মহিলা টয়লেটের মূল দরজা তালা লাগানো অনেক দিন ধরে। পুরুষের সঙ্গে একই দরজা দিয়ে তাঁদের ঢুকতে হয় ভাঙাচোরা একটি টয়লেটে। বেশির ভাগ পাবলিক টয়লেটের এই দশার কারণে অনেক কর্মজীবী নারীই বেছে নিয়েছেন বিকল্প ব্যবস্থা। ইসরাত জাহান স্বর্ণা নামের এক কর্মজীবী নারী জানান, বাড়ির বাইরে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হলে মেয়েদের ঝঞ্ঝাটে পড়তে হয়। তাই বাড়ির বাইরে বের হওয়ার সময় অনেক নারী স্বাভাবিকের চেয়ে কম পানি পান করেন। তাঁরা মনে করেন, বেশি পানি পান করলে পথে-ঘাটে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতে পারে। বর্তমানে শপিং মলগুলোয় পরিচ্ছন্ন বাথরুম থাকায় মেয়েরা বাইরের প্রাকৃতিক কাজ সারতে পারছেন। নইলে আরও বিপদের মধ্যে থাকতে হতো। একাধিক নারীর দাবি, এখন অনেক মহিলা চাকরি অথবা ব্যবসা করছেন। প্রতিদিন শত শত মেয়ে স্কুল-কলেজে যান। এ জন্য নগরের জনবহুল স্থানে মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার দরকার। এ বিষয়ে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া দরকার বলে তাঁরা মনে করেন।
যানে চড়তে যন্ত্রণা
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) একটি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নগরের সব মিনিবাসে ছয়টি ও বড় বাসে নয়টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। তবে নারী যাত্রী না থাকলে পুরুষ যাত্রীরা বসতে পারবেন। এই প্রজ্ঞাপন জারির পর বিভিন্ন পরিবহন সার্ভিসের লোকাল ও কাউন্টার সার্ভিসের বাসে ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন’ লিখে রাখা হয়েছে।
তার পরও সংরক্ষিত আসনে বসে কোনো কোনো পুরুষ মন্তব্য ছোড়েন, ‘নারীরা তো সমান অধিকারের কথা বলেন, তাহলে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে যেতে পারলে মহিলারা যেতে পারবেন না কেন? আমি সিট ছাড়ুম না।’
পরিবহনে যাতায়াত করা একাধিক নারী জানান, অনেক বাসকর্মী ও পুরুষ যাত্রী তাঁদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। হেলপাররা প্রয়োজন না হলেও তাঁদের শরীরে হাত দিয়ে বাসে ওঠায় বা নামায়। এ ছাড়া বাসের মধ্যে ভিড়ের সুযোগে অনেক পুরুষ যাত্রী নারীদের শরীরে হাত দেয়। পুরুষের সঙ্গে একই আসনে বসলে পর্যাপ্ত জায়গা থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে মহিলার দিকে এগিয়ে বসে।
সব মিলিয়ে যানবাহনে চড়া নগরের নারীদের কাছে যুদ্ধের চেয়েও জটিল এক আবহ তৈরি করেছে। দিনের ব্যস্ততম সময়ে বাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায় নারীদের। বাসে ওঠার সময় ও বাসের ভেতর গিয়ে নানাভাবে হেনস্থা হতে হয় তাঁদের। নারীদের চলাচলে সুবিধার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা (বিআরটিসি) ৩৩ বছর আগে মহিলা বাস সার্ভিস চালু করলেও বারবার বন্ধ হয়েছে সেটা। বিআরটিসি থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ২০০৬ সালে ছয়টি বাস দিয়ে সর্বশেষ মহিলা বাস সার্ভিস চালু করে বিআরটিসি। এরই মধ্যে তিনটি বাস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মিরপুর-১০ নম্বর থেকে মিরপুর-১ নম্বর, কল্যাণপুর, শ্যামলী ও নিউমার্কেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত একটি দোতলা বাস চলাচল করছে। মতিঝিল থেকে খিলগাঁও তালতলা রুটে চলাচল করছে আরও একটি দোতলা বাস। ওই বাসগুলো প্রতিদিন দুবার চলাচল করে। তবে সব সময় এই বাসগুলো পাওয়া যায় না বলে একাধিক নারী যাত্রী অভিযোগ করেছেন।
হোটেলে মেলে না ঠাঁই!
এক নারী ঢাকার বাইরে থেকে জরুরি কাজে এসেছিলেন মিরপুরে। ওই দিন কাজ সারতে না পারায় তাঁকে মিরপুরেই থাকতে হবে। কিন্তু ঢাকায় তাঁর এমন কোনো আত্মীয় নেই, যেখানে রাতটুকু কাটাবেন। অনেক খুঁজে তিনি এলেন মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের হোটেল বাগদাদে। কিন্তু হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে কোনো কক্ষ ভাড়া দিল না। তাঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো শাহ আলী থানায়। একটু পরে থানার টহল গাড়িতে তাঁকে এই হোটেলে নিয়ে আসা হয়। এভাবেই হোটেলের কক্ষ ভাড়া নিতে হলো ভদ্র মহিলাকে। ঘটনাটি জানালেন হোটেলের স্বত্বাধিকারী শফিকুল আলম। সঙ্গে কোনো পুরুষ না থাকলে এক বা একাধিক নারীও নগরের এক, দুই তারকা হোটেলে কক্ষ ভাড়া পান না বলে জানা গেছে। ফলে জরুরি কাজে ঢাকার বাইরে থেকে আসা অনেক নারী আশ্রয় আর নিরাপত্তাহীনতার দ্বৈত সংকটে পড়েন। নারী বোর্ডার থাকতে পারবে কি না জানতে চাইলে মহাখালী হোটেল এশিয়ার এক কর্মী ‘না’সূচক মাথা ঝাঁকায়। নগরের বেশির ভাগ এক তারকা এবং দুই তারকা হোটেলগুলোতে যৌনকর্মীদের আনাগোনা এত বেশি যে সেখানে কোনো নারীর একা থাকা নিরাপদ নয় বলে জানালেন মহাখালীর হোটেল ব্যবসায়ী রাজু সরকার। সঙ্গে পুরুষ না থাকলে নারীদের থাকতে দেওয়া হয় না কেন? নগরের একাধিক আবাসিক হোটেলের কর্মকর্তারা জানান, মেয়েদের নিরাপদ স্থান বেশি প্রয়োজন। কিন্তু উপকার করতে গিয়ে বিপদে পড়তে হবে। তাই আইনগত জটিলতা থেকে বাঁচতে থানার অনুমোদন ছাড়া মেয়েদের কাছে রুম ভাড়া দিই না।
সুত্রঃ প্রথম আলো
তারিখঃ মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০১১
তারিখঃ মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০১১

0 আপনার মতামত:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
এমন কোন মন্তব্য করবেন না যা রাজনীতিক বা সামাজিক ভাবে বিতর্কের সৃষ্টি করে।